1. ruhul.lemon@gmail.com : admin :
  2. tanjid.fmphs@gmail.com : তানজিদ শুভ্র : তানজিদ শুভ্র
  3. contact.mdrakib@gmail.com : Rakib Howlader : Rakib Howlader
বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৪:২৪ অপরাহ্ন

“দুঃস্বপ্ন নয়, ভয়াবহ বাস্তবতা”

  • প্রকাশ: শনিবার, ২ মে, ২০২০
  • ৬৪ বার পঠিত

হে বাংলাদেশের জনগণ, কোভিড ১৯ এর ক্রান্তিকালে তোমরা তো খুব ভালোই আছ। দেদারসে ঘুরে বেড়াচ্ছ হাওর-বাঁওড়ে, মাঠেঘাটে, পাড়ার অলিগলি, বাজারের ফুটপাতে ও রাস্তায়। বারবার ঘরে থাকো বলা স্বত্বেও আমাদের কথা তোমাদের কানেই পৌঁছে না। তোমরা নানা অজুহাতে ঘর থেকে বাহিরে যাচ্ছ। আবার ঘরে ফিরে বউ বাচ্চাদের সাথে, মা-বাবা, ভাই-বোনদের সাথে গালগল্পে মেতে ওঠেছ। জেনে রেখো, এই না-মানার ফল কিন্তু ভয়াবহ আকার ধারণ করবে খুব শীঘ্রই। তোমরা হয়ত ভাবছ, খুব ভালো আছ, তাই না? আপাতদৃষ্টিতে হয়ত তোমরা ভালোই আছ। কিন্তু আমরা ভালো নেই। কেননা, আমরা তোমাদেরকে ভালো রাখার জন্য, তোমাদের সুস্থতার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা সন্দেহে রোগীর কাছ থেকে প্রতিদিন নমুনা সংগ্রহ করছি, সেই নমুনা পরীক্ষা করে কোভিড ১৯ পজেটিভ না নেগেটিভ তাও তোমাদের জানিয়ে দিচ্ছি। পজেটিভ হলে তোমাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি। সমগ্র পৃথিবীজুড়ে COVID 19 আজ ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। অথচ তোমরা তা, পাত্তাই দিচ্ছ না। কেন এমনটা করছ তোমরা? টিভি চ্যানেল, ফেইসবুক, খবরের কাগজে প্রচারিত কোভিড ১৯ সংক্রান্ত বার্তা কি তোমাদের মনে একটুও ভয়ের সৃষ্টি করে না? যতদিন যাচ্ছে তোমাদের এই না মানার বিষয়টি আমাদের সত্যিই দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
তোমরা জেনে আশ্চর্যান্বিত হবে যে, আমরা যখন করোনা সন্দেহে রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে প্যাথলজি রুমে আসি, আমাদের অন্যান্য সহকর্মীবৃন্দ যারা এ কাজে জড়িত নয় তারা আমাদের বাঁকাচোখে দেখে, ভ্রু কুঁচকায়, আমাদের সঙ্গে মিশতে ভয় পায়, কথা বলতে ভয় পায়, আমরা যেন ভীনগ্রহের বাসিন্দা, আমরা যেন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কেউ একজন। আমাদের হাত থেকে কেউ কিছু নিতে চায় না। আসলেই তো,নেবেইবা কেন? কারণ আমরা নিজেরাও জানি না কোভিড ২৯-এ আক্রান্ত কী-না। পরীক্ষা না করলে তো জানার কোনও উপায় নেই। তা ছাড়া কোন সময় কে আক্রান্ত হবো কেউ জানি না। যদি আক্রান্ত হই তবে অন্যকে সংক্রমিত করার অধিকার তো আমাদের নেই। এত গেল আমাদের অফিসের প্রতিদিনের চিত্র। অন্যদিকে বাড়িতে আমাদের মা-বাবা ও বউ-বাচ্চারা আমাদের জন্য খুব দুশ্চিন্তায় থাকেন। খোদার কাছে সব সময় প্রার্থনা করতে থাকেন, ‘মাবুদ যেন আমাদের হেফাজতে রাখেন।’ আমরা যখন বাসায় ফিরি, মনের মধ্য অজানা সেই ভয়টা মাথাঠোকা দিয়ে ওঠে। যদি আমাদের থেকে বউ-বাচ্চারা সংক্রমিত হয়ে যায়, বাবা-মা, ভাই-বোনেরা সংক্রমিত হয়ে যায়, সেই ভয়ে তাদের সাথে কম কথা বলি, আলাদা রুমে ঘুমাই, আলাদা রুমে খাওয়া-দাওয়া, আলাদা বাথরুমে গোসল কার্য সম্পন্ন করি। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে হয়, বউ-বাচ্চা ও মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু যখন ভাবি, করোনা সন্দেহে রোগীর কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করছি গত দেড়মাস ধরে , এর মধ্য বেশ কয়েকজন কোভিড ১৯ পজেটিভ এসেছে, তখনই সে ইচ্ছা দূরে পালিয়ে যায়। মনটা বিষাদে ভরে ওঠে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে ডানা ভাঙা পাখির মতো। এই তো আজকেও আমার দুজন কলেজ বন্ধু ফেইসবুকে করোনা নিয়ে পোস্ট দিয়েছে। তাদের মধ্যে একজন শ্যামলী রানী দাস সে পোস্ট করেছে এভাবে, “মনটা ভীষণ খারাপ। আমার ছেলে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। কিন্তু আমি তাকে জড়িয়ে ধরার সাহস পাইনি। হে ঈশ্বর তুমি কৃপা কর।” এবার আপনারাই বলুন একজন মা তার ক্রন্দনরত সন্তানকে জড়িয়ে ধরতে পারছে না করোনা সন্দেহে রোগীর কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে বিধায়। সন্তান বুকে না নেওয়া যে কতোটা যন্ত্রণাদায়ক, তা মা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারবে না। অপরদিকে বন্ধু ফিরোজ ফেইসবুকে পোস্ট করেছে এভাবে,”সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ দুজন করোনা রোগী পজিটিভ যাহা আমি কালেকশন করেছি।” এই যে করোনা পজেটিভ রোগী থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সে এক ভয়াবহ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে, মানসিক যন্ত্রণায় কাটছে তার প্রতিটা মুহুর্ত, এ বিষয়টি সে ছাড়া অন্য কেউ তা কোনওভাবেই গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবে না। হয়ত আজ রাতে তার ঘুমই হবে না।
আরেক ভাই মন্তব্য করেছে, “সেদিন আমি ল্যাব থেকে বাসায় আসার পর,আমার ছেলে যে ভাবে দৌড়ে আসছে,শুধু একই কথা, বাবা তোমাকে একটা আদর দিই,অবশেষে ওর সাথে লুকোচুরি খেলে, বাসার সবার সহযোগিতায় ওকে ঘরবন্দি করে,তারপর গোসল করে ঘরে ঢুকলাম। আর এ সময়টা কেমন লেগেছিল তা কাউকে বুঝাতে পারবনা।”
এভাবেই বাংলাদেশের সব মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের (ল্যাব) জীবন আজ দুঃসহ যন্ত্রণার শিকলে বাঁধা। কষ্ট কী জিনিস, তারা তা মর্মেমর্মে উপলব্দি করছে করোনার এই ক্রান্তিকালে। আমিও গত কয়েকদিন আগে দুতিন রাত ঘুমাতে পারিনি, ঠিকমতো খেতে পারিনি, যেদিন শুনেছিলাম ডা ওসমান হায়দার ও ওয়াকিল আহমদ নামে ব্যাংক কর্মকর্তার নমুনায় কোভিড ১৯ পজেটিভ এসেছে। যাদের নমুনা সংগ্রহ করেছি আমি নিজেই। বারবার মনে হচ্ছে একটি ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে দিন যাচ্ছে আমাদের। যদিও তা দুঃস্বপ্ন নয়, ভয়াবহ বাস্তবতা। প্রতিদিন অনেক চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী এ ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে। যার সংখ্যা ৭০০ অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে সাধারণ লোকের মধ্যে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়েছে। তারমধ্যে মারা গেছে ১৬৮ জন, সুস্থ হয়ে ওঠেছে ১৬০ জন। এই অবস্থায় আমরা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট জাতি দেশের প্রথম সারির করোনা যোদ্ধা হয়ে কেমন করে ভালো থাকি। আমরা যদি এ যুদ্ধে জয় লাভ করতে না পারি, তোমাদের বাঁচাতে না পারি, তবে কীসের জন্য এ যুদ্ধ? একমাত্র তোমাদের সহযোগিতাই পারে আমাদের এ যুদ্ধে জয় লাভ করাতে। একজন করোনা যোদ্ধা হিসেবে, একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হিসেবে তোমাদের কাছে আমার আকুল আহ্বান তোমরা সমাবেশ ও গণঅনুষ্ঠানে না যেয়ে ঘরে থাকো, নিজে বাঁচো, পরিবারকে বাঁচাও, দেশকে বাঁচাও। দুখের কথা এই যে, দেশের এই দুঃসময়ে কদিন ধরে ফেইসবুকে দেখতে পাচ্ছি ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ লোকের মধ্যে তাণ্ডব শুরু হয়েছে।

উল্লেখ না করলেই নয়, আমাদের দেশে এ বছর রাজনৈতিক নেতা কর্মী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে গণসমাবেশ ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করে কৃষকদের উৎসাহিত করছেন, নিঃসন্দেহে এটি ভালো কাজ। তাদের এই সুন্দর ভাবনাকে স্যালুট জানাই কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখার কারণে আমরা যে ভয়াবহ বিপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি তা কি সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী নয় ? যেখানে পারিবারিক অনুষ্ঠান সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? এ প্রশ্ন আজ সরকার ও জাতির কাছে। পরিশেষে এটাই বলা যে, এভাবে যদি আমরা ঘরে না থেকে, রোজ বাহিরে বের হই, সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে নিজেদের খুশিমতো চলাফেরা করি, শুধুমাত্র এই কারণে কোভিড ১৯ এর ভয়াল থাবা থকে আমাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

 

| শেখ একেএম জাকারিয়া

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো বার্তা..
নিঃস্বত্ত্ব © সংগৃহিত তথ্যগুলোর স্বত্ব সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের। আমাদের নিজস্ব কোন স্বত্ব নেই।

কারিগরি সহায়তায় WhatHappen